Suswastha Online Services
Your first Bengali health magazine published every fortnightly since 1994 is available online.

Now read our published articles online. We are ready to reach out to millions of people across the globe.
“ নতুন কোরোনা ভাইরাস – এক প্রতিবেদন ”
ডাঃ তাপস ভট্টাচার্য
(মাইক্রোবায়োলিজস্ট)
৯০০৭১৩৩১৭৭ / ৯৮৩০৩৭৪৮৫২

কোরোনা ভাইরাস নিয়ে আতঙ্কের মধ্যে আমরা বরং সময়ের পাকদন্ডী বেয়ে খানিকটা পিছিয়ে যাই। সাল ১৯৪৬। সেলিসবারি (Salisbury) বৃটেনের এই ছবির মতো শহর ছাড়ানো এলাকায় রয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ফেলে যাওয়া আমেরিকান সৈন্য ছাউনি। এখানেই শুরু হয়েছে মেডিক্যাল রিসার্চ কাউন্সিলের ‘কমন কোল্ড ইউনিট’। উদ্দেশ্য সাধারণ সর্দি জ্বরের কারণ ও তার প্রতিষেধক খুঁজে পাওয়া। এই গবেষণার জন্য চাই ১৮ থেকে ৫০ বছর বয়েসের সুস্থ পুরুষ ও মহিলা। কাগজে বিঞ্জাপন বেরোল। বলা হল, মনোরম পরিবেশে আরামদায়ক ব্যবস্থায় দশ দিনের ছুটি কাটিয়ে যান। সঙ্গে পুষ্টিকর খাওয়া, সিনেমার ব্যবস্থা। সবটাই বিনামূল্যে। সঙ্গে ৩৫ পেন্স প্রতিদিন হাতখরচ। স্বাভাবিকভাবেই দলে দলে মানুষ নাম লেখালেন।

সর্দিজ্বরে আক্রান্ত মানুষের নাকের নিঃসরণ সুস্থ মানুষের নাকে প্রবেশ করানো হল। এবার এই রসে পরীক্ষা চলল। প্রথম দিকের পরীক্ষায় পাওয়া গেল এক বিশেষ ভাইরাস – রাইনোভাইরাস (Rhinovirus)। পরবর্তী সময়ে জানা গেল প্রায় শতকরা তিরিশ জন রোগির অসুস্থতার কারণ রাইনোভাইরাস নয়। অন্য এক ভাইরাস। ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপের তলায় এর মাপ ২৬০ ন্যানোমিটারের কম। আমরা জানি এক মাইক্রোমিটারের এক হাজার ভাগের এক ভাগ এক ন্যানোমিটার। এনভেলপ নামের আবরণযুক্ত এই ভাইরাস আর.এন.এ গোত্রের। এনভেলপের বাইরের অংশ যেন সূর্যের ছটার মতো ছড়ানো। সেই কারণে গবেষকরা নাম দিলেন কোরোনা ভাইরাস (Coronavirus)।

এই প্রথম মানুষের শরীরে কোরোনা ভাইরাস সংক্রমণের হদিশ মিলল। সময়টা ষাটের দশক। পরবর্তীকালে মোট চার ধরনের হিউম্যান কোরোনা ভাইরাস আবিষ্কার হল। এই সব ধরনের ভাইরাস থেকে সাধারণ সর্দি জ্বর ছাড়া অন্য কোন রোগ হয় না। সত্যি বলতে কী, হারভার্ড হসপিটাল, সেলিসবারি-এর রিসার্চ সেন্টার বন্ধই করে দিতে হল। এই রোগের কারণ হিসেবে অজস্র ধরনের ভাইরাস পাওয়া ও তাদের বিরুদ্ধে শরীরের সহজেই যুদ্ধ চালিয়ে জীবাণু ধবংস করার ক্ষমতা গবেষণা বন্ধ করার যুক্তি হয়ে দাঁড়ান।

তবে, কোরোনা ভাইরাস মুরগি, শূয়োর, কুকুর, গরুমোষ, ঘোড়া ও ইঁদুরের শরীরে কিন্তু সাংঘাতিক রোগ করতে পারে। তবুও বিঞ্জানীরা নিশ্চিন্তই ছিলেন। কেননা এই প্রজাতির কোরোনা ভাইরাস কখনোই মানুষের বিপদের কারণ হয়নি।

বিশেষজ্ঞদের নিশ্চিন্ত বিশ্বাসকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিল এক নতুন কোরোনা ভাইরাস। ২০০২-২০০৩ সালের মধ্যে এই ভাইরাস বিশ্বজুড়ে ত্রাস সৃষ্টি করল। হংকং-এর হোটেলে পাওয়া গেল প্রথম রোগির সন্ধান। এই মানুষটি এসেছিল চিন দেশের গুয়াংডং (Guangdong) প্রদেশ থেকে। ভাইরাসের সংক্ষিপ্ত নাম দেওয়া হল – সার্স-কোভ (SARS-CoV)। এই মারণ ভাইরাস থেকে অতি তীব্র সংক্রমণ ঘটল। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে ২৯ দেশে ছড়িয়েছিল সার্স কোরোনা ভাইরাস। মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৮০৯৮। মৃত ৭৭৪। মৃত্যুর হার ৯.৬ শতাংশ। ২০০৪ সালের পরে আর কোন রুগি পাওয়া যায়নি। এই ভাইরাসের উৎস চিহ্নিত করা হল এক বিশেষ ধরনের বাদুড়।

দীর্ঘ বিরতির পর ২০১২। আবারও এক ভয়ানক কোরোনা ভাইরাস। এবার কেন্দ্র সাউদি আরাবিয়া। রোগ ছড়াল আশেপাশের দেশগুলোতে। ২০১২ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে মোট রোগির সংখ্যা ২২২৯। মৃত ৭৯১। মৃত্যুহার বেশ খানিকটা বেশি – ৩৫.৫ শতাংশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই ভাইরাসের নাম দেয় মার্স-কোভ (MERS-CoV)। এই ভাইরাসের উৎস সঠিকভাবে জানা না গেলেও বিঞ্জানীদের অনুমান বাদুড় ও উটের মাধ্যমে এই রোগ ছড়িয়াছে।

আজ এসবই অতীত। কেননা এবারের কোরোনা ভাইরাসের তীব্রতা আগের দুটি ভাইরাস অনেক বেশী তীব্র। এই লেখা বেরোনো পর্যন্ত সংখ্যা কী দাঁড়াবে বলা যাচ্ছে না। তবে এই মুহুর্তে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ২,৩০,০০০ ছাড়িয়ে গিয়েছে। মারা গিয়েছেন ৯,৩৯১ জন। সুস্থ হয়ে উঠেছেন ৮৬,২৬১। এই রোগ ছড়িয়ে পড়েছে ইয়োরোপ, আমেরিকা ও এশিয়ার বহু দেশে। অর্থাৎ, এক অভূতপূর্ব কোরোনা ভাইরাস মহামারীর সাক্ষী হতে চলেছে আবিশ্বমানুষ।

আমরা ইতিমধ্যে জেনে নিয়েছি, এ রোগও শুরু হয়েছে চিন দেশের উহান এলাকায়। ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৯ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার চিন দেশের শাখা প্রথম ঘোষণা করে এই নতুন প্রজাতির কথা। জানুয়ারি মাসে সতর্কতা জারি হয়েছে। আর ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ সালে মহামারী ঘোষণা কর হল। সেদিনই এই নতুন ভাইরাসের নাম ঘোষণা হল COVID-19, অর্থাৎ ‘কোরোনা ভাইরাস ডিজিজ-১৯’।

এই ভাইরাসের ষড়যন্ত্রের অনেকটা কারণ তার নানা ধরনের গঠনগত প্রোটিন বা স্ট্রাকচারাল প্রোটিন (Structural protein)। চারটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিন হল – স্পাইক প্রোটিন (Spike, S); নিউক্লিওক্যাপসিড প্রোটিন (N); মেমব্রেন প্রোটিন (M) ও এনভেলপ প্রোটিন (E)। এই প্রোটিনগুলোর মূল কাজ ভাইরাসের আকৃতি তৈরি করার। কিন্তু এছাড়াও প্রতিটি প্রোটিন ভাইরাসের বংশবৃদ্ধি ও বিস্তারে নানাভাবে সাহায্য করে। স্পাইক প্রোটিন আক্রান্ত প্রানীকোষের সঙ্গে ভাইরাসকে যুক্ত হতে সাহায্য করে। এই সংযুক্তির ফলে ভাইরাসের প্রবেশ সহজ হয়। শুধু তাই নয়। কোষের ভেতর ঢুকে যাওয়ার পর ভাইরাসের এই স্পাইক প্রোটিন আক্রান্ত কোষের কোষ আবরণে দেখা দেয়। তখন এই কোষ পাশের অন্যান্য সুস্থ কোষের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। ভাইরাসও সুযোগ পায় পাশাপাশি কোষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার। এর ফলে আক্রান্ত প্রাণীর শরীরে তৈরি হওয়া অ্যান্টিবডি ভাইরাসের নাগাল পায় না। কেননা ভাইরাস তখন কোষ থেকে কোষান্তরে গোপন পথ তৈরি করে নিয়েছে যা অ্যান্টিবডির ধরা ছোঁয়ার বাইরে। নিউক্লিওক্যাপসিড প্রোটিন কোরোনা ভাইরাসের বংশবিস্তারে সাহায্য করে। কোরোনা ভাইরাসের গঠনে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে থাকে মেমব্রেন প্রোটিন। বিপরীত ভাবে এনভেলপ প্রোটিনের পরিমাণ সবচেয়ে কম ভাইরাস দেহে। এই প্রোটিন সবচেয়ে ছোট মাপের। অথচ এই প্রোটিনের অজস্র ভূমিকা। বিঞ্জানীদের এনভেলপ প্রোটিন এখনও এক রহস্য। এখনও পর্যন্ত তিনটি বিশেষ কাজ করতে দেখা গিয়েছে এনভেলপ প্রোটিনের। প্রথমটি হল ভাইরাসের নানা অংশকে গুছিয়ে এনে পূর্ণ রুপ দেওয়া। কোষের মধ্যে তৈরি হওয়া অসংখ্য ভাইরাস যাতে বাইরে বেরিয়ে এসে অন্য কোষ আক্রমণ করতে পারে সেই কাজে সাহায্য করা আরেকটি দায়িত্ব। এছাড়া রোগ ঘটাতেও সাহায্য করে এই বিশেষ প্রোটিন।

এখন গবেষকরা আরেকটি স্ট্রাকচারাল প্রোটিনের সন্ধান পেয়েছেন যা পরিচিত হিমঅ্যাগ্লুটিনিন-এমটারেজ (HE) নামে। নতুন ধরনের কোরোনা ভাইরাসে এই প্রোটিন পাওয়া গিয়েছে যা স্পাইক-প্রোটিনকে বিশেষ ভাবে সাহায্য করে। ফলে ভাইরাস আরও দ্রত কোষের ভেতর প্রবেশ করে। এছাড়া শ্বাসনালীর ঝিল্লি-আবরণের ওপর কোরোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়াতেও এই প্রোটিনের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।

কোরোনা ভাইরাস মূলত দুভাবে প্রাণীর কোষের ক্ষতি করে। প্রথমত কোষ ধবংস করে দেয় এই ভাইরাস। এছাড়াও শ্বাসনালীর কোষের গায়ে সূক্ষ্ণ সূক্ষ্ণ রোঁয়া বা সিলিয়া (Cilia) ধবংস করা ও তার কার্যকারিতা নষ্ট করে দেয় কোরোনা ভাইরাস। এরফলে শরীরের প্রাথমিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভাইরাসকে মিউকাস আস্তরণের সঙ্গে বাইরে বার করে দিতে পারে না।

এই আলোচনার শেষে আমরা যে সিদ্ধান্তে পৌঁছই, তাতে বোঝা যায়, এই মারণ ভাইরাসের হাতিয়ারগুলো সক্রিয় হয়ে উঠে হন্তারক শত্রু হয়ে দাড়িয়েছে মানব সভ্যতার কাছে।

এই নতুন কোরোনা ভাইরাস সম্বন্ধে আমরা ইতিমধ্যেই বেশ কিছু তথ্য জানতে পেরেছি। এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছে মূলত রোগীর সঙ্গে সরাসরি শারীরিক সম্পর্কের মাধ্যমে; রোগীর ব্যবহার করা জিনিস, পোষাক ইত্যাদি থেকে। তৃতীয় যে উপায় তাকে ডাক্তারি পরিভাষায় বলা হয় ‘ড্রপলেট ইনফেকশন’। এই ড্রপলেট সংক্রমণ নিয়ে আমরা কিছুটা বিশদে আলোচনা করব। ড্রপলেট কথার অর্থ, অতি সূক্ষ্ণ জলকণা। এই জলকণার মাপ মাত্র কয়েক মাইক্রো-মিটার। জানিয়ে রাখা যাক, এক মাইক্রোমিটার এক মিলিমিটারের হাজার ভাগের এক ভাগ। কীভাবে তৈরি হয় এই সূক্ষ্ণ জলকণা? যখনই আমরা কথা বলি, হাঁচি, কাশি অথবা নাক পরিষ্কার করি তখন অসংখ্য জলকণা তৈরি হয়। এই জলকণাগুলো সবেগে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে, প্রতিবার হাঁচির সঙ্গে ১৫,০০০ থেকে ২০,০০০ ড্রপলেট বাতাসে ছড়ায়। আর যে গতিবেগে এই কণাগুলো বেরিয়ে আসে তা অবিশ্বাস্য – ঘণ্টায় ১০০ থেকে ২০০ মাইল। প্রতিটি জলকণায় থাকতে পারে অসংখ্য ভাইরাস ও ব্যাকটিরিয়া। যে ড্রপলেট কণার মাপ ১০ মাইক্রোমিটার বা তার থেকে বেশি তারা ১ থেকে ৫ মিটারের মধ্যে মাটিতে ঝরে পড়ে। তাই যে সমস্ত রোগের জীবাণু ড্রপলেট বাহিত তারা ৫ মিটারের মধ্যে থাকা মানুষকে সংক্রামিত করে। ১০ মাইক্রোমিটারের বেশি মাপের ড্রপলেট আমাদের নাকের ঝিল্লি আবরণের মিউকাসে আটকে যায়। কিন্তু ৫ মাইক্রোমিটার বা তার চেয়ে কম মাপের জলকণার সঙ্গে জীবাণু সরাসরি ফুসফুসের অন্দরমহলে বাসা বাঁধে। এবার আমরা ‘ড্রপলেট নিউক্লিয়াস’-এর কথাও জেনে নেব। যে সব ড্রপলেট ১ থেকে ৪ মাইক্রোমিটারের মধ্যে তারা বাতাসের সংস্পর্শে এলে শুকিয়ে যায় ও সূক্ষ্ণ ধুলোকণায় সংপৃক্ত হয়। অর্থাৎ জলের আশ্রয় থেকে ভাইরাস বা ব্যাকটিরিয়া এবার বাতাসের ধুলোকণায় বাসা নেয়। এই ধুলোকণা বাতাসে বহুক্ষণ ভেসে থাকে আর বাতাসের স্রোতে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস এভাবেই ছড়ায়। কোরোনা ভাইরাসও কিছু পরিমাণে বাতাস বাহিত হয়ে থাকে।

আমাদের এই আলোচনার মধ্যে কিছু কিছু বিঞ্জানী সংশয় প্রকাশ করেছেন এই বলে যে, নতুন কোরোনা ভাইরাস জল ও খাবারের সঙ্গে ছড়াবার সম্ভাবনা রয়েছে। সার্স-কোরোনা ভাইরাসের বেলায় এ সম্ভাবনা প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু এখন যে ভাইরাস নিয়ে আমাদের আলোচনা তাতে একথা প্রমাণ করা যায়নি। তবু বলা হচ্ছে, মলত্যাগের পর ভালো করে সাবান জলে হাত ধুয়ে নিতে হবে।

এই রোগজীবাণু শরীরে প্রবেশ করার ১৪ দিনের মধ্যে রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়। আক্রান্ত মানুষের শরীর লক্ষণ দেখা দেবার দুদিন আগে থেকে লক্ষণ বোঝা যাবার পরের চারদিন, ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা সবথেকে বেশি।

রোগের লক্ষণ তিনটি : জ্বর, শুকনো কাশি ও শ্বাসকষ্ট। এই রোগে আক্রান্ত শতকরা ৮০ জন মানুষের উপসর্গ সাধারণ সর্দি-জ্বর বা ‘কমন কোল্ড’ জাতীয়। শ্বাসকষ্টের প্রবলতার ওপর নির্ভর করে রোগীর মৃত্যুহার। এই রোগে মৃত্যুর কারণ নিউমোনিয়া ও শ্বাসজনিত সমস্যা, সেপসিস আর সেপটিক শক। মৃত্যুর হার শতকরা প্রায় দুই-ভাগ। বয়স্ক মানুষ, ডায়াবিটিস ও অন্যান্য রোগের কারণে যাদের অনাক্রম্যতা বা ইমিউনিটি অত্যন্ত কমে গিয়েছে তাঁরাই এই রোগে মারা যাচ্ছেন।

যে সব আক্রান্ত মানুষ সাধারণ উপসর্গে ভুগছেন তাদের বাড়িতে রেখে চিকিৎসা করতে হবে। চিকিৎসকের চেম্বারে অথবা বাড়িতে চিকিৎসক ডেকে পরীক্ষা করিয়ে নিতে হবে। সারাদিনের জলের পরিমাণ ঠিক রাখতে হবে যাতে শরীরে জলের অভাব জনিত সমস্যা না দেখা দেয়। যদি রোগীর জ্বর বাড়তে থাকে; শ্বাস দ্রত হয়ে যায় ও শ্বাসকষ্ট প্রবল হয় তবে নিউমোনিয়া সন্দেহ করে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া দরকার। হাসপাতালে অবস্থা বুঝে রোগীকে অক্সিজেন দেওয়া, শিরার মাধ্যমে জলের ঘাটতি মেটানো ও অন্য সংক্রমণ আটকাবার জন্য ওষুধ প্রয়োগ করা হবে। রোগীর অবস্থা আরও খারাপ হলে ভেন্টিলেশনে দিতে হবে।

এছাড়াও যেসব মানুষকে সরাসরি হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে তাঁরা হলেন,

১) রোগের উপসর্গ দেখা দেবার ১৪ দিনের মধ্যে যাঁরা বিদেশ ভ্রমণ করেছেন; ২) যে সমস্ত স্বাস্থ্যকর্মী কোরোনা ভাইরাস আক্রান্ত মানুষের পরিচর্যা করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন; ৩) যে সব মানুষের শারীরিক অবস্থার হঠাৎ অবনতি হতে শুরু করেছে।

কোভিড-১৯ ভাইরাস আক্রান্ত মানুষের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে যাঁরা এসেছেন তাঁদের নিয়মিত পরীক্ষা করা আর প্রয়োজনে ১৪ দিনের অন্তরালে (quarantine) রাখা। কেন্দ্রিয় সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রক যে বিঞ্জপ্তি জারি করেছে (১৭.০৩.২০২০) সেই অনুযায়ী ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের অবস্থা বিশেষ ভাবে বলা হয়েছে।

  • যে সব মানুষ কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীকে স্বাস্থ্য পরিষেবা দিচ্ছেন; যাঁরা অসুস্থ স্বাস্থ্যকর্মীর সংস্পর্শে এসেছেন; যাঁরা কোরোনা আক্রান্ত রোগীর সঙ্গে দেখা করেছেন অথবা তাদের সঙ্গে একই ঘরে থেকেছেন।
  • একই সেমিনার রুম অথবা ক্লাসরুমে কোভিড-১৯ রোগীর সংস্পর্শে এসেছেন।
  • যে কোন ধরনের যানবাহনে যাঁরা কোভিড-১৯ রোগীর সহযাত্রী।
  • কোভিড-১৯ রোগীর এলাকায় যাঁরা বাস করছেন।

যে সব মানুষ জ্বর, কাশি নিয়ে বাড়িতে থাকছেন তাঁদের জন্য কিছু বিশেষ নির্দেশিকা :

  • চিকিৎসা সংক্রান্ত ব্যাপার ছাড়া ঘরের বাইরে বেরোনো বারণ;
  • বেশি অসুস্থ হয়ে পড়লে চিকিৎসককে ফোনে খবর দিন;
  • বাস, ট্যাক্সি, ট্রেন এড়িয়ে চলুন;
  • সম্ভব হলে আলাদা ঘরে থাকুন ও আলাদা বাথরুম ব্যবহার করুন;
  • যদিও কোভিড-১৯ ভাইরাস কোন প্রাণীর শরীরে সংক্রামণ ঘটায়নি, তবু যতটা সম্ভব ঘরের পোষ্যদের এড়িয়ে থাকুন;
  • যদি পোষ্যকে দেখার আলাদা লোক না থাকে তবে প্রতিবার পোষ্যের সংস্পর্শে আসার আগে ও পরে হাত ধুয়ে ফেলুন;
  • অসুস্থ মানুষ সুখোশ (mask) ব্যবহার করুন। যদি রোগীর মাস্ক পড়লে অসুবিধে হয় তবে তার সংস্পর্শে আসার সময় বাড়ির অন্য সদস্যরা মাস্ক ব্যবহার করুন;
  • রুমাল বা টিসু পেপার দিয়ে মুখ ও নাক ডাকুন, প্রত্যেক কাশি ও হাঁচির সময়। টিসু পেপার ডাস্টবিনে রাখুন ও রুমাল সাবান-জলে ধুয়ে ফেলুন। নয়ত নিজের কনুই ভাঁজ করে নাক ও মুখ আড়াল করুন;
  • প্রত্যেকবার সাবান-জলে হাত ধোয়ার সময়, অন্তত কুড়ি সেকেন্ড সময় দিন। ৭০ শতাংশ অ্যালকোহল যুক্ত ‘হ্যান্ড-রাব’ ব্যবহার করতে পারেন। যখনই কাশছেন, হাঁচছেন অথবা নাক পরিষ্কার করছেন; যখন বাথরুম যাচ্ছেন; ও খাবার তৈরি করার আগে এবং পরে হাত ধুয়ে ফেলুন;
  • নিজের নাক, মুখ বা চোখে হাত দেওয়া থেকে বিরত থাকুন;
  • নিজের থালা, গ্লাস, বাটি, তোয়ালে, গামছা, বিছানা আলাদা রাখুন। প্রতিটি জিনিস ব্যবহারের পর ভালো করে সাবান-জলে ধুয়ে নিন।
  • নিজের ঘর ও বাথরুম জার্ম-ক্লিনিং তরল দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। দরজার হাতল, ফোন, রিমোট কন্ট্রোল, কী-বোর্ড মুছে রাখুন;
  • বাড়ির ধুলো ময়লা সাবান অথবা ডিটারজেন্ট দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে। জার্ম নষ্ট করার জন্য ব্লিচিং পাউডার বা ব্লিচিং সল্যুশন। অবশ্য গ্লাভস পরে পরিষ্কারের কাজ করতে হবে। কফ ও থুথু ফেলার পাত্রে ব্লিচিং পাউডার গুলে দিয়ে রাখতে হবে।

যে সব রোগী কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে বাড়িতে একান্তে রয়েছেন তাঁরা কদিন এভাবে থাকবেন? এই প্রশ্নের উত্তর আমেরিকার ‘সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল’ কিছু নির্দেশিকা জারি করেছে। সেই অনুযায়ী পরপর দুদিনের পরীক্ষায় যাঁদের স্যাম্পলে ভাইরাস পাওয়া যায়নি তাঁরা বাড়ির বাইরে যেতে পারেন। যাঁদের পরীক্ষা করা সম্ভব হয়নি তাদের জন্য নির্দেশিকায় তিনটি বিষয়ে বলা হয়েছে – ১) পরপর তিনদিন অর্থৎ মোট ৭২ ঘণ্টার মধ্যে যদি জ্বরের ওষুধ (প্যারাসিটামল) না খাওয়া সত্ত্বেও জ্বর আসেনি; ২) শরীরের উপসর্গের তীব্রতা অনেকটা কমে গিয়েছে; এবং ৩) প্রথম উপসর্গ দেখা দেবার পর অন্তত ৭ দিন কেটে গিয়েছে।

এবার সবথেকে স্পর্শকাতর বিষয়ে আমরা আলোচনা করব – কোভিড-১৯ ভাইরাস কীভাবে নির্ণয় করা হবে।

প্রথমে আমরা জানি, শরীরের কোন অংশ নিয়ে পরীক্ষা করতে হবে। বিশেষঞ্জরা জানাচ্ছেন, রোগীর কফ ও নেজোফেরেনজিয়াল (nasopharyngeal) এবং ওরোফেরেনজিয়াল (oropharyngeal) সোয়াব নিয়ে পরীক্ষা করতে হবে।

এরজন্য সোয়াব (swab) অর্থৎ সরু কাঠির মাথায় ডেক্রন অথবা রেয়ন লাগানো (তুলো নয়) জীবাণুশূন্য সোয়াব – স্টিক ব্যবহার করে রস নিতে হবে। এই স্যাম্পল উপযুক্ত পদ্ধতিতে ল্যাবরেটরিতে পাঠাতে হবে। এখনও পর্যন্ত এ রোগের কোন সেরোলজিক্যাল (serological) টেস্ট আবিষ্কার হয়নি। অর্থৎ, অ্যান্টিজেন বা অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করা সম্ভব নয়। একমাত্র ভাইরাসের রাইবোনিউক্লিয়িক অ্যাসিড (RNA) পরীক্ষা করে রোগ নির্ণয় করতে হবে যা বিজ্ঞানের পরিভাষায় পলিমারেজ চেন রিঅ্যাকশন (PCR) নামে পরিচিত। এই পদ্ধতি জটিল ও ব্যায় সাপেক্ষ। তাই আমাদের দেশে খুব অল্প জায়গাতেই এখনও পর্যন্ত করা হচ্ছে যা অনেক গবেষকের মতে প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। কোন ধরনের আক্রান্তের জন্য এই পরীক্ষা করা হবে তা নিয়েও গবেষক মহলে মতভেদ রয়েছে। ভারত সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী শুধুমাত্র দু ধরনের পরিস্থিতিতে এই পরীক্ষা করা যাবে- ১) গবেষণাগারে প্রমাণিত কোভিড-১৯ আক্রান্ত মানুষের ঘনিষ্ট সম্পর্কে যাঁরা এসেছেন। ২) যে সব মানুষ বিগত ১৪ দিনের মধ্যে কোরোনা ভাইরাস আক্রান্ত দেশ থেকে ভারতে প্রবেশ করেছেন ও ১৪ দিনের গৃহবন্দী অবস্থায় যাঁদের শরীরে রোগের উপসর্গ দেখা দিয়েছে।

কেন ভারত সরকারের এই সিদ্ধান্ত? তাঁদের বিশেষঞ্জ কমিটির মতে ভারতে এখনও পর্যন্ত সমস্ত কোরোনা-আক্রান্ত মানুষ সরাসরি ঘনিষ্ট সংস্পর্শের মাধ্যমে এই রোগের ভাইরাস বহন করছে। অর্থৎ, জনগণের মধ্যে একজন থেকে আরেকজনে রোগ ছড়িয়ে পড়েনি, যাকে পরিভাষায় আমরা বলি ‘কমিউনিটি স্প্রেড’ (community spread)। কিন্তু কিছু কিছু গবেষক এ বিষয়ে সহমত নন। তাঁদের মতে আমরা অবশ্যই অজান্তে সেই পর্যায়ে প্রবেশ করেছি। যদি পরিস্থিতি তাই হয় তবে আগামি কিছুদিনের মধ্যে রোগাক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বিপুল হয়ে দেখা দেবে।

এবার আসা যাক চিকিৎসা প্রসঙ্গে। প্রাথমিক অবস্থায় রোগিকে বিশ্রামে রাখা; তার পুষ্টির মাত্রা ঠিক রাখা-পর্যাপ্ত প্রোটিন আহার ও জল খেতে দেওয়া ও উপসর্গের চিকিৎসা। যেমন, জ্বর হলে প্যারাসিটামল (paracetamol) ও নাক দিয়ে জলপড়া, হাঁচি ইত্যাদির জন্য অ্যান্টি-অ্যালজির্ক ওষুধ। রোগের পরবর্তী পর্যায়ে অন্যান্য ব্যবস্থা নিতে হবে। এখনও পর্যন্ত এ রোগের নির্দিষ্ট ওষুধ (অ্যান্টি ভাইরাল) আবিষ্কার হয়নি। তবে, ভারত সরকারের নির্দেশিকায় কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে দুটি অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ একসঙ্গে প্রয়োগ করার কথা বলা হয়েছে – লোপিনাভির এবং রিটোনাভির (Lopinavir, Ritonavir)। ইন্টারফেরন ও রিবাভিরিন ব্যবহার হয়েছে পূর্ববর্তী ভাইরাস সংক্রমণে।

গবেষণার স্তরে রয়েছে কিছু বিশেষ অণু যা আক্রান্ত কোষ ও ভাইরাসের পারস্পরিক প্রোটিন – প্রোটিন ইন্টারঅ্যাকশন (PPI)-কে প্রভাবিত করে ভাইরাসের বংশবৃদ্ধি ও বিস্তার নিয়ন্ত্রিত করবে। বিজ্ঞানীরা কিছু বড় প্রোটিন অণু যেমন, ইনসুলিন, গ্রোথ ফ্যাক্টরস, জেনেটিক ইনজিনিয়ারিং-এর মাধ্যমে তৈরি অ্যান্টিবডি ব্যবহারের কথা ভেবেছেন। কিছু বিশেষ প্রোটিন অণু বা স্টেপলড পেপটাইডস (stapled peptides) ব্যবহার করার সম্ভাবনা বাড়ছে যা ভাইরাসকে নানা স্তরে প্রতিহত করার ক্ষমতা রাখে। কোন কোন বিজ্ঞানী ‘অটোফ্যাগি’ (autophagy) পদ্ধতি কাজে লাগিয়ে ভাইরাস আক্রান্ত কোষ ধ্বংস করার কথা ভাবছেন। কোন টিকা আবিষ্কার করে তার প্রয়োগ – এখন বহু দূরবর্তী বিষয়। তাই এ ব্যাপারে কোন স্বস্তি পাওয়া যাচ্ছে না।

তাই রোগ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আমাদের দুটি বিষয়ে জোর দিতে হবে, জনস্বাস্থ্য সক্রান্ত নিবিড় যোগাযোগ ভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ ও দ্রুত আরও বেশি করে রোগ নির্ণয় পদ্ধতির ব্যবস্থা। এ বিষয়ে সফল হবার জন্যও প্রয়োজন স্বচ্ছ, সুদৃঢ় রাজনৈতিক শুভেচ্ছা ও পর্যাপ্ত অর্থের সংস্থান। দুর্ভাগ্যবশত ভারতবর্ষে এ দুটি বিষয় নিয়ে আমাদের সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে। তবে একথা আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে, এ রোগের ভয়াবহতা আটকানোর প্রধান উপায়, আক্রান্ত মানুষ ও যাদের রোগ হবার সম্ভাবনা খুবই বেশি তাদের ঘরবন্দী – স্বেচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় – করে রাখা। কিন্তু এই গরিব দেশে ক’জন মানুষের একাধিক ঘর রয়েছে? তাছাড়াও যে সব মানুষ ঘরহীন, আশ্রয়হীন খোলা আকাশের নীচে পরিবার পরিজন নিয়ে দিন কাটায় তাঁদের আমরা কীভাবে এর আওতায় আনব। এক সমীক্ষা জানাচ্ছে, শুধুমাত্র কলকাতায় প্রায় এক লক্ষ মানুষ ফুটপাতে দিন কাটায়!

এই অভূতপূর্ব বিপর্যয় কি আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক চেতনাকে বদলে দেবে? ভারতের যে সব মানুষ ভাবেন, তাঁরা ইশ্বরের কাছের মানুষ তাঁদের ভাবনায় কী বদল ঘটবে? মানুষে মানুষে বিভেদের যে রাজনীতি ও হিংসাত্মক সমাজনীতি আমাদের ধীরে ধীরে গিলে নিচ্ছে তার অবসান কি আমরা আশা করতে পারি? সঠিক বিজ্ঞান চেতনাই যে মানুষকে এ ধরনের বিপর্যয় মোকাবিলায় সাহায্য করবে এ কথা কি আমাদের অভিভাবকদের কাছ থেকে শুনতে পাব? ইদানিং যে দেশপ্রেমের কথা আমরা শুনছিলাম তার কি গুণগত কোন পরিবর্তন ঘটবে? চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর প্রতি আমাদের যে প্রবল বিদ্বেষ তা কি আমরা কমাতে পারবো? স্বাস্থ্যকর্মীরাও কি এমন বিপর্যয়ের মুখে ধৈর্য না হারিয়ে সাহসের সঙ্গে আক্রান্ত মানুষের পাশে থাকবেন? সমাজের অতি সচ্ছ্বল মানুষ কি আর একটু সংবেদনশীল হবেন? তাঁদের অশ্লীল বিলাসিতার প্রকাশ কি খানিকটা কমবে না? মানুষের ক্ষুধার অন্ন কেড়ে নেবার মানসিকতা থেকে দেশের বণিক মহল কি যুক্ত হতে পারবেন? এসব প্রশ্নের এখনই কোন উত্তর নেই। কিন্তু সমাজ বাঁচাতে গেলে, নীরোগ সমাজের প্রতিষ্ঠায় এসব উত্তর খোঁজা জরুরি।

আসুন, ততক্ষণ আমরা সওয়াল-জবাবে কোভিড-১৯ নিয়ে এক সংক্ষিপ্ত আলোচনা সেরে নিই।

১) কোভিড-১৯ ভাইরাস কাকে বলে? সাম্প্রতিক কোরোনা ভাইরাসের এই প্রজাতি গত বছর ডিসেম্বর মাস থেকে মহামারী ঘটিয়েছে। ২) এ রোগ কীভাবে ছড়ায়? ভাইরাস আক্রান্ত মানুষ থেকে এই রোগ ছড়িয়ে পড়েছে। মূলত ‘ড্রপলেট ইনফেকশন’ ও অচেতন বস্তুর সংস্পর্শে আসার ফলে। বাতাসের মাধ্যমে ছড়ানোর সম্ভাবনা কম। ৩) রোগী থেকে কতটা দূরত্বে থাকা নিরাপদ? রোগী থেকে কমপক্ষে এক মিটার বা তিন ফুট দূরে থাকতে হবে। ৪) মাস্ক ব্যবহার কি বাধ্যতামূলক? সাধারণভাবে মাস্ক ব্যবহার করার প্রয়োজন নেই। রোগের উপসর্গ দেখা দিলে অথবা সংক্রামিত মানুষের সংস্পর্শে এলে মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। ৫) কী ধরনের মাস্ক ব্যবহার করতে হবে? সাধারণ কাজকর্মের সময় যারা অন্য মানুষের কাছাকাছি আসবে তাদের জন্য সুতির কাপড় তৈরি মাস্ক যথেষ্ট। আক্রান্ত রোগী ও যে সব মানুষ এই রোগীর ১-২ মিটারের মধ্যে আসবে তাদের জন্য প্রয়োজন তিন পরতের সার্জিকাল মাস্ক (triple layer surgical mask)। রোগীর সরাসরি সংস্পর্শে এলে অবশ্যই ব্যবহার করতে হবে এন ৯৫ (N 95) মাস্ক। ৬) রোগীর ঘরে এসি মেশিন চলবে? হ্যাঁ, চলবে। তবে তারজন্য বিশেষ নির্দেশিকা রয়েছে। ৭) এসি ঘরে থাকলে কী সুস্থ মানুষের আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা বাড়বে? একেবারেই নয়। তবে সেন্ট্রাল এসি নিয়ে কিছুটা সমস্যা রয়েছে। সেখানে বদ্ধ বাতাস পুরো বাড়িতে সঞ্চালন করা হয়। ফলে ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি একটু থেকে যায়। ৮) রোদে দাঁড়ালে ভয় কম? এমন কোন প্রমাণ নেই। বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যাও নেই। ৯) সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি মানা উচিত কতটা? সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি সবটাই মানা উচিত। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা; নিয়মিত স্নান; পোষাক রুমাল প্রভৃতি ধুয়ে ফেলা; রাস্তা ঘাটে কফ থুথু না ফেলা – সবই খুব প্রাসঙ্গিক। ১০) হোমিওপ্যাথি বা আর্য়ুবেদিক কোন চিকিৎসা রয়েছে? আধুনিক বিজ্ঞানের মাপকাঠিতে এমন কোন বিকল্প চিকিৎসা প্রমাণিত হয়নি। ১১) ইনফ্লুয়েঞ্জা ও নিউমোকক্কান ভ্যাকসিনের কোন ভূমিকা রয়েছে? কোরোনা ভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে এই ভ্যাকসিনের কোন ভূমিকা নেই। ১২) গরম আবহাওয়া বা ঠান্ডা আবহাওয়ায় কি এই ভাইরাস মারা যায়? না। যে কোন পরিবেশে এই ভাইরাস সক্রিয়। ১৩) গরমজলে চান করলে এই রোগের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে? না, এমন কোন প্রমাণ নেই। ১৪) মশার কামড় থেকে এই রোগ হতে পারে? একেবারেই নয়। ১৫) হ্যান্ড-ড্রায়ার কি এই ভাইরাস ধ্বংস করে? কোন সম্ভাবনা নেই। ১৬) আল্ট্রাভায়োলেট ল্যাম্প জ্বালালে ভাইরাস মরবে? বাতাসে ভাইরাসের সংখ্যা কমতে পারে। কিন্তু এই আলো আমাদের ত্বক ও চোখের পক্ষে ক্ষতিকারক। ১৭) গায়ে অ্যালকোহল মাখলে বা ব্লিচিং পাউডার জলে গুলে লাগালে এই নতুন ভাইরাস নষ্ট হয়? একেবারেই নয়। যে ভাইরাস শরীরে ঢুকে গিয়েছে তার মৃত্যু ঘটবে না। বরং অ্যালকোহল (৭০%) দিয়ে হাত ধুলে ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকানো যাবে। ১৮) স্যালাইন জলে নাক ধুলে রোগের সম্ভাবনা কমবে? এমন কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ১৯) রসুন খেলে রোগ ঠেকানো যাবে? রসুন স্বাস্থ্যের পক্ষে ভাল। তবে এই নতুন কোরোনা ভাইরাস রসুন খেলে নষ্ট হবে না। ২০) এই ভাইরাস কি শুধুমাত্র বড়দের আক্রমণ করে? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সব রকম বয়েসের মানুষকে সতর্ক থাকতে বলেছে। ২১) অ্যান্টিবায়োটিকের কি কোন ভূমিকা রয়েছে? না। অ্যান্টিবায়োটিক শুধু ব্যাকটিরিয়ার বিরুদ্ধে কাজ করে; ভাইরাসের বিরুদ্ধে নয়। ২২) কোভিড-১৯ নিয়ে সোস্যাল মিডিয়ায় অনেক লেখালেখি চলচে। সেগুলো কি সঠিক? শুধুমাত্র বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও নিজেদের দেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রকের কথা শুনুন। ২৩) এ রোগ কি আটকানো সম্ভব? চিন ও অন্যান্য কয়েকটি দেশ এই ভাইরাস সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে। তাই আমাদের সবার প্রতিঞ্জা ও সদিচ্ছা থাকলে অন্য দেশেও তা সম্ভব। ২৪) আমাদের কি আতঙ্কিত হওয়া উচিত? এই রোগের উপসর্গ এখনও শতকরা আশিজনের শরীরে খুবই মামুলি ধরনের। তবে প্রতি পাঁচজন আক্রান্তের মধ্যে একজনকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হচ্ছে। আমরা ভয় না পেয়ে বরং হাত ধোয়া ও অন্যান্য প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়মিত মেনে চলব। ২৫) মানুষের শরীরের বাইরে এই ভাইরাস কতক্ষণ সক্রিয় থাকে? কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিন। ২৬) ভাইরাস আক্রান্ত এলাকা থেকে আসা প্যাকেট খোলা কি নিরাপদ? হ্যাঁ। কেননা, এভাবে রোগ সংক্রমণের সম্ভাবনা খুবই কম। ২৭) আমার কি কোন অভ্যাস এড়িয়ে চলা উঁচিত? অবশ্যই। সিগারেট ও বিড়ি খাওয়া বন্ধ করুন। গুটখা খেয়ে বা পানমশালা খেয়ে যেখানে সেখানে থুথু ফেলা বন্ধ করুন। মুখ ও নাক চাপা না দিয়ে কাশবেন না বা হাঁচবেন না। একাধিক মাস্ক পরবেন না। অ্যান্টিবায়োটিক খাবেন না ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া। ২৮) আগামী দিনে কি চিকিৎসকদের পরামর্শ বদলে যাবে? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২৪X৭ সময় ধরে এ রোগের সমস্ত ধরনের খবর বিশ্লেষণ করে চলেছে। নতুন বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে সাধারণ কিছু অদলবদল হতে পারে। সে ব্যাপারে আমাদের ওয়াকিবহাল থাকতে হবে। কোনরকম গুজবে কান দেবেন না বা তা ছড়াতে সাহায্য করবেন না। ২৯) পরবর্তীকালে যদি হাত ধোয়ার জন্য সাবানও অমিল হয়? পরিষ্কার জলে ভাল করে হাত ধুয়ে নিলেও ভাইরাসের সংক্রমণ কমানো যাবে। ৩০) বাড়িতে মাস্ক বানানো যায়? অবশ্যই বানাতে পারেন। বেশি দাম দিয়ে কালোবাজারিতে মাস্ক কিন্তে যেবেন না।

[বিশেষ সতর্কতা : কোভিড-১৯ ভাইরাস সংক্রান্ত যে কোন তথ্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাইটে গিয়ে দেখে নিন।]

Articles Archive

নাক ডাকা থেকে হতে পারে হার্ট অ্যাটাক

Dr. Parthajyoti Mondol  

নাকে একটা ছোট্ট ফুসকুড়ি এবং সেটা থেকেই অবশেষে মৃত্যু | হ্যাঁ, শুনলে অনেকেই হয়তো অবাক হবেন তবে বাস্তবে নাকে একটা ছোট ফুসকুড়িও অবহেলায় ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে। সেজন্যই বোধহয় নাককে বলা হয় ‘ডেঞ্জার এরিয়া অফ দি ফেস’। আমাদের নাকে একটা শিরা আছে . . .

স্কোলিওসিসের ব্যথায় আকুপাংচার

Dr. Sandip Sengupta  

বছর দু’য়েক আগের কথা। অঞ্জলীদেবী নামে এক ভদ্রমহিলা এলেন চিকিৎসা করাতে। বয়স তিরিশ-বত্রিশ। পিঠের মাঝখানে এক জায়গায় তীব্র ব্যথায় বেশ কিছুদিন হল কষ্ট পাচ্ছেন। ঠান্ডাগরম কোনো সেঁক দিয়েই আরাম পান না। কোনো চোট-আঘাত লেগেছে বলে তিনি মনে করতে পারছেন . . .

ব্লাডপ্রেসারের গণ্ডগোলেও হতে পারে থ্রম্বোসিস

Dr. Partha Vishnu ( Neurosurgery )

রক্তের যে ধমনীগুলো থাকে, যার মধ্যে দিয়ে রক্ত চলাচল করে, সেই ধমনীর ভিতর রক্ত জমাট বেঁধে যাওয়ার ফলে থ্রম্বোসিস হয়। ব্রেনের গতিপথে রক্ত জমাট বেঁধে হতে পারে সেরিব্রাল থ্রাম্বোসিস। কাদের হতে পারে যাদের ডায়াবেটিস আছে, ব্লাডপ্রেসার আছে বেশি, যাদের পারি . . .

শিশুদেরও হতে পারে স্ট্রোক

Shantanu Guriya ( Pediatrician )

‘স্ট্রোক’ কথাটি শুনলে এখনও অনেকের মনে হয় এটা হয়তো হৃদরোগই। এবং এটা শুধুমাত্র বড়দেরই হয়ে থাকে। সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে রক্ত চলাচলে ব্যাঘাত ঘটার ফলে যে অব্যবস্থা জন্ম নেয়, তাকে বলে স্ট্রোক। অর্থাৎ স্ট্রেক মানে হল ব্রেন . . .

হোমিওপ্যাথির প্রভাব কি কমছে

Dr. Ramkrishna Ghosh Mondal  

বিভিন্ন চিকিৎসা পদ্ধতিরই যেমন রোগ আরোগ্যের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা আছে, সেরূপ প্রতিবন্ধকতা হোমিওপ্যাথিক পদ্ধতিরও রয়েছে। হোমিওপ্যাথিক ওষুধকে শক্তিকৃত করার পর সেটিকে অসীম শক্তির ওষুধরূপে পরিণত করা গেলেও এই ওষুধেরও দ্বারা অনেক রোগের আরোগ্য হলেও তারও একটা স . . .

গলা ব্যথা হলেই কিন্তু গার্গল নয়

Dr. Kuntal Maiti  

ফ্যারিংস হচ্ছে গলার মধ্যেকার খাদ্যনালীর একটি অংশ যেটা জিভ ও নাকের পিছন থেকে শুরু হয়ে যেখানে আমরা শ্বাস নিই সেই শ্বাসনালীর অংশ পর্যন্ত বিস্তৃত। এই ফ্যারিংসে যখন প্রদাহ হয় তখন তাকে ফ্যারিনজাইটিস বলা হয়।   ফ্যারিনজাইটিসের ধরন ফ্যারিনজাইটিস সা . . .

Suswastha Publication

Over the years Suswastha has published several books on different health issues and subjects written by eminent doctors and practitioners.

All Books

Subscribe for latest update

Subscribe to our newsletters and stay updated!